মুক্তিনিউজ২৪.কম ডেস্ক : চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা চলার কথা তুলে ধরে সরকারি এক গবেষণার তথ্যে বলা হয়েছে, অনলাইনে চাকরির বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে একটি পদের জন্য আবেদন করেন প্রায় ২৮৭ জন।
এ সংখ্যা কোভিড মহামারীর আগের সময়ের তুলনায় বেশি; মহামারীর আগে আবেদন করতেন প্রায় ১৭৩ জন।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) যৌথ উদ্যোগে এ গবেষণাটি হয়েছে, যার প্রতিবেদন বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়েছে।
‘লেবার মার্কেট টাইটনেস অ্যান্ড অ্যাগ্রিগেট শকস: এভিডেন্স ফ্রম বাংলাদেশস লার্জেস্ট অনলাইন জব পোর্টাল’ শীর্ষক গবেষণার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোভিড মহামারীর সময় দেশের শ্রমবাজারে যে ধাক্কা লাগে, সেটা এখনো বিরাজ করছে। প্রতিবছর বাড়ছে চাকরি প্রার্থীর সংখ্যা। ফলে অনুষ্ঠানিক চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে।
রাজধানীর আগাঁরগাওয়ে বিআইডিএস-এর সম্মেলনের কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারীর আগে চাকরির একটি পদের জন্য গড়ে ১৭৩ দশমিক ২টি আবেদন জমা পড়ত। তবে ২০২০ সালের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ৭০ দশমিক ২ শতাংশ কমে যায়।
একই সময়ে শূন্য পদের সংখ্যা কমে ৭৫ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু চাকরিপ্রার্থীর আবেদন কমে মাত্র ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে প্রতি একটি পদের বিপরীতে আবেদন বেড়ে দাঁড়ায় ২৮৭ দশমিক ৩ জনে, যা পুরো গবেষণা সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
গবেষণায় মহামারীর সময়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে উচ্চ-আয়ের দেশের তুলনাও করা হয়।
এতে দেখা যায়, ওই সময়ে শূন্য পদ কমার হার ছিল যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪০ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ।
গবেষণাটি পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির বিভাগের অধ্যাপক গবেষক অধ্যাপক অতনু রব্বানী। ২০১৫ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৫৪৭ সপ্তাহের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
শুধু অনলাইন চাকরির পোর্টাল বিডিজবস এর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, খালি পদ, চাকরির আবেদন এবং প্রতি পদের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা বিশ্লেষণ করে আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এ গবেষণায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাকরি বাজারে পড়া ‘লকডাউনের’ প্রভাব ছিল দীর্ঘস্থায়ী। প্রথম সপ্তাহেই চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা স্বাভাবিকের তুলনায় ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে যায়। তিন মাস পর এই চাপ সর্বোচ্চ ২৯ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছায়। প্রায় নয় মাস পর্যন্ত প্রতিযোগিতা উচ্চ পর্যায়ে থাকে এবং ‘লকডাউনের’ নির্দিষ্ট ধাক্কা কাটিয়ে বাজার স্বাভাবিক প্রবণতায় ফিরতে সময় লাগে প্রায় ৪১ সপ্তাহ।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্তও চাকরির বাজার পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফেরেনি। এ সময় প্রতি পদের বিপরীতে আবেদন মহামারী-পূর্ব স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় গড়ে প্রায় ২১ শতাংশ বেশি ছিল।
এই গবেষণায় শুধু আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু ৮৫ থেকে ৮৯ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠিক খাতে কাজ করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহারের পরিবর্তনও চাকরির বাজারে খুব কম প্রভাব ফেলেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নীতি সুদহারের পরিবর্তন চাকরির বিজ্ঞপ্তির মাত্র ৬ শতাংশ পরিবর্তন তুলে ধরে। অর্থাৎ আকস্মিক বড় ধরনের সংকটের তুলনায় ধীরগতির মুদ্রানীতির প্রভাব অনলাইন চাকরির বাজারে তুলনামূলকভাবে কম।
গবেষক অতনু রব্বানী বলেন, “প্রচলিত শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য প্রকাশে কয়েক মাস সময় লাগে। ফলে চাকরির বাজারে আকস্মিক সংকট দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। কিন্তু অনলাইন জব পোর্টালের তথ্য ব্যবহার করলে কয়েক দিনের মধ্যেই চাকরির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।
“অনলাইন জব পোর্টালের তথ্য শ্রমবাজারে আকস্মিক পরিবর্তনের দ্রুত সংকেত দিতে পারে। তাই প্রচলিত শ্রমশক্তি জরিপের পাশাপাশি এ ধরনের তথ্য নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করা উচিত। একই সঙ্গে চাকরি হারানো আনুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য আরও শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।”
অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, “শ্রমবাজারের বাস্তব চিত্র, কর্মসংস্থানের অবস্থা এবং নীতির প্রভাব নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করতে নির্ভরযোগ্য তথ্যের কোনো বিকল্প নেই। কারণ সঠিক তথ্যের ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় নীতিগত সংশোধন করা সম্ভব।”
গত ১৭ বছরে ব্যাংক খালি করে ফেলা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, “ক্যাপিটাল মার্কেট ধসে দেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ ফাইনান্সিয়াল সেক্টর খুবই নাজুক।”
অনেকগুলো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী সাকি বলেন, “চেষ্টা করা হচ্ছে ‘মনিটরি ও ফিসক্যাল’ পলিসির একটা ব্যালেন্স তৈরি করে কীভাবে এই বিনিয়েোগকে উৎসাহিত করা যায়। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়বে বলে আশা করি।”