
আমরা সাধারণত গ্রহগুলোকে অত্যন্ত প্রাচীন ও স্থির জগৎ হিসেবে ভাবি। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি গ্রহের জন্ম হয় মহাজাগতিক বিশৃঙ্খলা, তীব্র সংঘর্ষ আর ধূলিকণার ঘূর্ণাবর্ত থেকে। তারা ধীরে ধীরে বড় হয়, বিবর্তিত হয় এবং একসময় নিজস্ব নিয়মে বার্ধক্যে পৌঁছায়। কোনো কোনো গ্রহ বিস্ময়কর দীর্ঘকাল টিকে থাকে, আবার কোনোটি নাটকীয়ভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। একটি গ্রহের আয়ু ঠিক কত—তার উত্তর নির্ভর করে নানা বিষয়ের ওপর। বিজ্ঞানীদের মতে, এ ক্ষেত্রে গ্রহের নিজের বৈশিষ্ট্যের চেয়ে তার মাতৃ–নক্ষত্রই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রহের ভাগ্য নির্ধারিত হয় তার নক্ষত্রের আচরণ, কক্ষপথের স্থিতিশীলতা এবং চারপাশের মহাজাগতিক পরিবেশের ভিত্তিতে। বিশেষজ্ঞরা জানান, তরুণ নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা গ্যাস ও ধূলিকণার চাকতিতে ক্ষুদ্র কণার সমাবেশ থেকেই গ্রহের সূচনা। সময়ের সঙ্গে এসব কণা সংঘর্ষের মাধ্যমে বড় হতে থাকে। একসময় মহাকর্ষ শক্তি সক্রিয় হয়ে এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। জ্যোতিঃপদার্থবিদ Sean Raymond–এর মতে, অসংখ্য সংঘর্ষের ধারাবাহিকতায়ই একটি গ্রহ পূর্ণ আকৃতি পায়। বৃহস্পতির মতো গ্যাসীয় দানবও প্রথমে বিশাল পাথুরে কেন্দ্র গড়ে তোলে, পরে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের ঘন স্তর নিজের দিকে টেনে নেয়।
তবে সব গ্রহের পরিণতি এক নয়। অন্য গ্রহের সঙ্গে সংঘর্ষ বা নক্ষত্রের প্রভাবে অনেক গ্রহ ধ্বংস হয়ে যায়। গ্রহবিজ্ঞানী Matthew Reinhold–এর মতে, কোনো গ্রহ তখনই ‘মৃত’ বলে বিবেচিত হয়, যখন সেখানে প্রাণ ধারণের বা পূর্বের সক্রিয় অবস্থা বজায় রাখার ক্ষমতা আর থাকে না। সমুদ্র শুকিয়ে যাওয়া, টেকটোনিক প্লেটের গতি থেমে যাওয়া কিংবা বায়ুমণ্ডল হারিয়ে ফেলা—এসবই একটি গ্রহকে মৃত করে দিতে পারে।
আমাদের Earth–এর ভবিষ্যৎ সরাসরি জড়িয়ে আছে Sun–এর সঙ্গে। বর্তমানে সূর্য তার কেন্দ্রে হাইড্রোজেনকে হিলিয়ামে রূপান্তর করে আলো ও তাপ উৎপন্ন করছে, যা পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। কিন্তু নক্ষত্রেরও আয়ু সীমিত। প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর সূর্যের হাইড্রোজেন ফুরিয়ে এলে এটি আকারে স্ফীত হয়ে লাল দানবে রূপ নেবে। সূর্য পৃথিবীকে গ্রাস করার আগেই তার বাড়তি উজ্জ্বলতা পৃথিবীর সমুদ্রের পানি বাষ্পীভূত করে ফেলতে পারে। শেষ পর্যন্ত পৃথিবী হয়তো সূর্যের অভ্যন্তরে বিলীন হবে, কিংবা সূর্যের ভর কমে যাওয়ার ফলে কক্ষপথ বদলে মহাকাশে ছিটকে পড়বে। সব মিলিয়ে সৃষ্টি থেকে সম্ভাব্য ধ্বংস পর্যন্ত পৃথিবীর আয়ু ধরা হয় প্রায় ৯৫০ কোটি বছর।
তবে মহাবিশ্বের সব নক্ষত্র সূর্যের মতো নয়। অনেক ছোট ও শীতল নক্ষত্র রয়েছে, যাদের বলা হয় Red dwarf। এরা অত্যন্ত ধীরগতিতে জ্বালানি পোড়ায়, ফলে এদের চারপাশে ঘূর্ণায়মান গ্রহগুলো অনেক দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। রেইনহোল্ডের মডেল অনুযায়ী, কোনো গ্রহের প্রকৃত আয়ু নির্ভর করে তার অভ্যন্তরীণ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ওপরও। টেকটোনিক প্লেট ও ম্যান্টল কনভেকশন কার্বন–সিলিকেট চক্রের মাধ্যমে গ্রহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে—যা এক ধরনের প্রাকৃতিক থার্মোস্ট্যাটের মতো কাজ করে। রেড ডোয়ার্ফ নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা পাথুরে গ্রহে এই প্রক্রিয়া ৩০ থেকে ৯০ বিলিয়ন বছর পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। তবে মহাবিশ্বের বহু পাথুরে গ্রহ তাদের নক্ষত্র নিভে যাওয়ার অনেক আগেই অভ্যন্তরীণভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে পারে।
সূত্র: The Times of India