মুক্তিনিউজ২৪.কম ডেস্ক : ব্যবসার প্রয়োজনে স্ত্রীর কাছে এক লাখ টাকা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল স্বামীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ ছিল, টাকা দিতে না চাওয়ায় স্ত্রীকে কাঠের লাঠি দিয়ে মারধর করেন তিনি।
এ ঘটনায় করা মামলায় নিম্ন আদালতে দুই বছরের কারাদণ্ডও হয়েছিল তার। তবে আপিলের শুনানিতে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও চিকিৎসা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, ব্যবসার জন্য টাকা চাওয়াকে যৌতুক দাবি হিসেবে প্রমাণ করা যায়নি। পাশাপাশি নির্যাতনের অভিযোগেও পাওয়া গেছে গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি।
এ অবস্থায় নিম্ন আদালতের দেওয়া দণ্ড বাতিল করে মো. রাসেল উদ্দিন নামের ওই ব্যক্তিকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালত মামলাটিকে সাজানো ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন।
রবিবার (১১ অক্টোবর) হাইকোর্টের বিচারপতি মো. সেলিমের একক বেঞ্চ এ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মুসলিম আইন অনুযায়ী মো. রাসেল উদ্দিন ও ইসমত আরা বেগমের বিয়ে হয়। বিয়ের প্রায় সাড়ে তিন বছর পর, ২০১৯ সালের ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় কক্সবাজার শহরের বাইতুশ শরফ মসজিদ রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন স্ত্রী।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, ওই দিন রাসেল উদ্দিন ব্যবসার কাজে ব্যবহারের জন্য স্ত্রীর কাছে এক লাখ টাকা চান। স্ত্রী টাকা দিতে অপারগতা জানালে তাকে কাঠের লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। পরে এ ঘটনায় মামলা করেন ইসমত আরা বেগম।
মামলাটির বিচার শেষে ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ রাসেল উদ্দিনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। তাকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন রাসেল উদ্দিন।
আপিলের শুনানিতে মামলার সাক্ষ্য, নথিপত্র ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেন হাইকোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, টাকা চাওয়ার কারণ হিসেবে বাদী ও সাক্ষীরা ব্যবসার কথা বলেছেন। অর্থাৎ বিয়ের শর্ত হিসেবে কিংবা বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখার বিনিময়ে ওই অর্থ দাবি করা হয়েছিল, এমন প্রমাণ মামলার নথিতে পাওয়া যায়নি।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ২(ঞ) ধারায় যৌতুকের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে আদালত বলেন, শুধু টাকা চাওয়ার ঘটনা দিয়ে সেটিকে যৌতুক দাবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। অভিযোগের ক্ষেত্রে অর্থ দাবির উদ্দেশ্য ও প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।
এই মামলায় ব্যবসার প্রয়োজনে টাকা চাওয়ার বিষয়টি সাক্ষীদের বক্তব্যে উঠে এলেও তা বিয়ের শর্ত বা বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখার বিনিময়ে দাবি করা হয়েছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে যৌতুক দাবির অভিযোগ আইনগতভাবে প্রমাণ করতে প্রসিকিউশন ব্যর্থ হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেন হাইকোর্ট।
শুধু যৌতুক দাবির অভিযোগ নয়, স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রেও সাক্ষ্য-প্রমাণে অসংগতি খুঁজে পান আদালত। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, বাদী তার জবানবন্দিতে লাঠির আঘাতে ডান কাঁধ ও পিঠে আঘাত পাওয়ার কথা বলেন। অন্যদিকে, চিকিৎসকের সাক্ষ্য ও হাসপাতালের মেডিক্যাল সনদে বাঁ কাঁধে আঘাতের কথা উল্লেখ ছিল।
আঘাতের স্থান নিয়ে বাদীর বক্তব্য ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথির এই পার্থক্যকে গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি হিসেবে বিবেচনা করেন হাইকোর্ট। আদালতের মতে, মৌখিক সাক্ষ্য ও চিকিৎসা-প্রমাণের মধ্যে এমন বৈপরীত্য থাকলে নির্যাতনের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়ে।
মামলার সামগ্রিক সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথিপত্র ও চিকিৎসা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করেন। একই সঙ্গে মো. রাসেল উদ্দিনকে খালাস দেন।
এ রায়ে আদালতের মূল বিবেচ্য বিষয় ছিল, ব্যবসার প্রয়োজনে অর্থ দাবি করাকে যৌতুক হিসেবে গণ্য করার মতো প্রমাণ রয়েছে কি না এবং নির্যাতনের অভিযোগ সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না।
অর্থাৎ স্ত্রীর কাছে টাকা চাওয়ার ঘটনা থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যৌতুকের অভিযোগে পরিণত হয় না। আইনের নির্ধারিত সংজ্ঞা, অর্থ দাবির প্রেক্ষাপট এবং মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই বিষয়টি বিচার করতে হবে—এ মামলার রায়ে সেই পার্থক্যটি গুরুত্ব পেয়েছে।