প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ৫:৩৮ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ৬:২৭ পি.এম

ইব্রাহিম আলম সবুজ রাজারহাট কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায় দেড় কিলোমিটার সড়কের বেহাল দশায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। সড়কজুড়ে ছোট-বড় প্রায় ৪০টি গর্ত, উঠে গেছে পিচের আস্তরণ, কোথাও বেরিয়ে এসেছে ইটের খোয়া। আবার কিছু স্থানে ভেঙে পড়েছে রাস্তার পাশের মাটি। বর্ষায় গর্তে পানি জমে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে, আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালিতে দুর্ভোগ বাড়ে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের দাবি জানানো হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
সড়কটি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের সিঙ্গারডাবড়ীহাট বাজার থেকে কুড়ারপাড় বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত। সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে গর্ত তৈরি হওয়ায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে চালকদের বারবার গতি ও দিক পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এতে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যানন্দ, ঘড়িয়ালডাঙ্গা ও রাজারহাট সদর ইউনিয়নের প্রায় ৩০টি গ্রামের মানুষ নিয়মিত এই পথ ব্যবহার করেন। সিঙ্গারডাবড়ীহাট বাজারের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি ঘড়িয়ালডাঙ্গা, কানুরাম, রামপাড়া, চেতনা, কুড়ারপাড়, কামারপাড়া, রতিগ্রাম, চতুরা ও দিনাসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের যাতায়াতের জন্য সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ।
কুড়ারপাড় এলাকার বাসিন্দা হারুন মিয়া বলেন, রাস্তা দিয়ে মোটরসাইকেল চালালে মনে হয় পাহাড়ে উঠছি, আবার নামছি। কোমরের বারোটা বেজে যায়।
চেতনা গ্রামের বাসিন্দা মোছা. হামিদা বেগম বলেন, এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করলে ঝাঁকুনিতে আধমরা হয়ে যেতে হয়। অটোতে গেলেও মনে হয় কোমর ভেঙে যাচ্ছে। একদিন এই রাস্তা দিয়ে গেলে সাত দিন পর্যন্ত কোমরে ব্যথা থাকে।
সড়কের ভগ্নদশার কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন অটো ও ভ্যানচালকেরা। খানাখন্দে চলাচল করতে গিয়ে যানবাহনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি গর্তে চাকা পড়ে গাড়ি উল্টে যাওয়া কিংবা যাত্রী নিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে। এ কারণে কেউ কেউ এ পথে চলাচল করতে চান না। আবার যাতায়াতের বিকল্প পথ না থাকায় যাত্রীদের বাধ্য হয়ে এই সড়ক ব্যবহার করতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া।
চৌকিদারপাড়ার অটোচালক রায়হান বাদশা বলেন, আগে এই রাস্তা দিয়ে ভাড়া মারতাম। এখন তো যাওয়াই যায় না। গেলেও বেশি ভাড়া নিতে হয়। উপায় নেই বলেই যাই। যাওয়া-আসার পথে যদি একটা দুর্ঘটনা ঘটে, তখন কী হবে?
ভ্যানচালক মোসলেম উদ্দিন বলেন, এই রাস্তা দিয়ে মাল নিয়ে যাওয়া কঠিন। সবখানে ভাঙা। গাড়ি নিয়ে গেলে উল্টে যাওয়ার ভয় থাকে।
সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করে প্রায় ১১০০ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে রয়েছে সিঙ্গারডাবড়ীহাট বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, সিঙ্গারডাবড়ীহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, শিশু নিকেতন স্কুল, এডুকেয়ার প্রি-ক্যাডেট স্কুল, সিঙ্গারডাবড়ীহাট দাখিল মাদ্রাসা ও পাটোয়ারীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের কেউ সাইকেলে, কেউ অটোতে, আবার কেউ হেঁটে বিদ্যালয়ে যায়। অনেকে সিঙ্গারডাবড়ীহাট এলাকায় প্রাইভেট ও কোচিং করতেও যাতায়াত করে। ফলে দিনে দুই থেকে চারবার পর্যন্ত ভাঙাচোরা পথ পাড়ি দিতে হয় তাদের। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
সিঙ্গারডাবড়ীহাট বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নন্দিতা কর্মকার বলে, আমি সাইকেলে যাই। রাস্তায় ভাঙাচোরা বেশি থাকায় যেতে কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে সাইকেলের চাকাও পাংচার হয়ে যায়।
একই শ্রেণির শিক্ষার্থী লামিয়া বলে, আমার সাইকেল নেই। অটোতে কুড়ারপাড় পর্যন্ত যেতে হয়। রাস্তা ভাঙা থাকায় অটো যেতে চায় না। মাঝে মাঝে অটো না পেলে হেঁটে যেতে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হ্যাচারীরপাড় এলাকায় আগে একটি ইটভাটা ছিল। সে সময় সড়কটি দিয়ে অতিরিক্ত ওজনের ভারী যানবাহন চলাচল করত। তাঁদের ধারণা, ভারী যানবাহনের চাপে ওই অংশের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। দ্রুত সংস্কার না করা হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সড়কটি আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুস প্রামাণিক বলেন, আমি মাসিক সভায় একাধিকবার এই রাস্তাটির বিষয়টি উত্থাপন করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।
রাজারহাট উপজেলা প্রকৌশলী মো. এজাহারুল হক বলেন, এক বছর আগে রাস্তাটি আম্পান প্রকল্পের আওতায় সংস্কারের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। তবে বিলম্ব হওয়ায় পুনরায় রাস্তাটি যৌথ প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
তবে সংস্কারকাজ কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে প্রায় ৩০টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম এবং ছয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের এই সড়ক নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। জনদুর্ভোগ কমাতে দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।