বৃহস্পতিবার-১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ-১লা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ,-রাত ১০:১২

Reg No-36 (তথ্য মন্ত্রনালয় কর্তৃক নিবন্ধনকৃত)

শিরোনামঃ সুপারিশপ্রাপ্তদের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভেরিফিকেশন ফরম পূরণের নির্দেশ টি-টোয়েন্টি দলের নেতৃত্ব ছাড়ছেন কোহলি গণমাধ্যমে শৃঙ্খলা আনার দাবি সাংবাদিকদেরই : তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী নির্বাচনী এলাকায় ২০ সেপ্টেম্বর ব্যাংক বন্ধ পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে : ডিএমপি কমিশনার আজও ৫১ জনের মৃত্যু বিএনপি অরাজকতা করলে কঠোর হাতে দমন: কৃষিমন্ত্রী

বাংলাদেশে বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনাময় ৭টি বিদেশি ফল

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৭ আগস্ট, ২০২১ , ৮:৪৮ পূর্বাহ্ণ , বিভাগ :

মুক্তিনিউজ২৪.কম ডেস্ক: বাংলাদেশে বেশ কয়েক বছর ধরে নানা ধরনের বিদেশি ফল চাষ হচ্ছে। দেশীয় বাজারে এসব ফলের চাহিদা থাকার কারণে অনেকেই ফল চাষের দিকে ঝুঁকছেন।

 

কৃষিবিদরা বলছেন, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে অনেকেই কাজ হারানোর কারণে গ্রামে ফিরে গেছেন। দেশের বাইরে থেকেও ফিরে এসেছেন অনেক শ্রমিক। আর তারাও গ্রামে গিয়ে কৃষিকাজের দিকে ঝুঁকছেন।

 

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বর্ষব্যাপী ফল উৎপাদন ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ড. মেহেদি মাসুদ জানান, এর আগের বছর (২০১৯-২০২০) ফলের চারা কলমের বিক্রি হয়েছিল ৩ কোটি টাকার। এ বছর (২০২০-২০২১) তা বেড়ে চারা কলম বিক্রির মাত্রা দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার মতো।

 

তিনি বলেন, “কৃষিকাজের দিকে আগ্রহ বাড়ছে উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের। প্রচলিত ধারার বাইরে এসে তারা নানা ধরনের কৃষিপণ্য চাষে আগ্রহী হচ্ছে। আর এগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে বিদেশি ফল।”

 

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশে যে সময়টাতে দেশি ফলের সরবরাহ কম থাকে সেই সময়টাতে যাতে পুষ্টির চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় তার জন্য বিদেশি ফল চাষের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।

 

এই প্রতিষ্ঠানটির উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ফল বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. বাবুল চন্দ্র সরকার বলেন, সাধারণত মে থেকে জুলাই মাসে বাংলাদেশের বাজারে প্রচুর ফলের সরবরাহ থাকে। এর পর থেকেই তা কমতে থাকে। এ কারণেই এই সময়টাতে অন্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে উৎপাদিত ফল যাতে এ দেশেও উৎপাদন করা যায় সেদিকে নজর দেয়া হচ্ছে।

 

বাংলাদেশে যেসব বিদেশি ফল চাষ করা হচ্ছে এবং সেগুলো থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে তার মধ্যে রয়েছে-

 

ড্রাগন ফল
বিদেশি ফলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় ফল হচ্ছে ড্রাগন। এটি সুস্বাদু, রঙিন এবং আকারে বেশ বড়।

 

 

ড. বাবুল চন্দ্র সরকার বলেন, ড্রাগন ফলে যে রঙিন পিগমেন্টেশন থাকে তা দেহের পুষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

 

এ ছাড়া একবার গাছ রোপণের পর বেশ কয়েক দফায় ফল আহরণ করা সম্ভব। বাংলাদেশে সাদা, লাল, গোলাপি এবং হলুদ প্রজাতির ড্রাগন ফল চাষ করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফলন হয় পিংক বা গোলাপি প্রজাতিটির।

 

আবহাওয়া অনুযায়ী সারা বাংলাদেশেই ড্রাগন ফল উৎপাদিত হয়। তবে সবচেয়ে ভালো উৎপাদিত হয় পাহাড়ি এলাকায়।

 

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক ড. মেহেদি মাসুদ জানান, এক একর জমিতে ড্রাগন ফল চাষ করে বছরে ৫-৬ লাখ টাকা লাভ করা সম্ভব।

 

তিনি বলেন, প্রতি হেক্টর জমিতে ১০-১২ টন ড্রাগন ফল উৎপাদিত হয়। অনেক এ ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ২০ টনও হয়ে থাকে।

 

এ ছাড়া যেসব জমিতে পানি জমে থাকে না, সেসব জমিতেও ড্রাগন ফল উৎপাদিত হতে পারে।

 

ড. বাবুল চন্দ্র সরকার বলেন, কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট থেকে ড্রাগন ফলের একটি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। যা এ দেশের আবহাওয়া উপযোগী। এর নাম বারি ড্রাগন ফল-১। এটি বেশ মিষ্টি হয়ে থাকে। আকারেও বেশ বড় হয়।

 

তবে কৃষিবিদরা, এক সাথে একই জমিতে একাধিক প্রজাতির ড্রাগন ফল চাষের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এতে করে পরাগায়ন ভাল হওয়ার কারণে ফলনও বেশি হয়।

 

স্ট্রবেরি
ড্রাগন ফল ছাড়া আর যে ফলটির বেশ চাহিদা রয়েছে সেটি হচ্ছে স্ট্রবেরি। সারাদেশেই স্ট্রবেরি উৎপাদন সম্ভব। রঙিন এই ফলটিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে।

 

 

ডিসেম্বর থেকে শুরু করে মার্চ পর্যন্ত স্ট্রবেরি উঠে থাকে। এ ছাড়া মাঝে এপ্রিলেও স্ট্রবেরি পাওয়া যায়।

 

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধীনে স্ট্রবেরির তিনটি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে বারি-১, বারি-২ এবং বারি-৩।

 

ড. বাবুল চন্দ্র সরকার বলেন, বারি-১ যখন উদ্ভাবন করা হয় তখন সেখানে একটা সমস্যা ছিল। সেটি হচ্ছে, পাকা স্ট্রবেরি তোলার পর সেটি চার ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হতো না। পচে যেত। ফলে কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়তেন।

 

এই সমস্যাটি কাটিয়ে উঠতে বারি-২ ও পরে বারি-৩ জাত দুটি উদ্ভাবন করা হয়। এই দুটি জাত পাকার পর দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত রাখা যায়।

 

সেই সাথে এই দুটি জাতের স্ট্রবেরি আকারে বড় এবং মিষ্টি হয়ে থাকে। যার কারণে বাজার দরও ভালো পাওয়া যায়। দেশে বাজারে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে প্রতিকেজি স্ট্রবেরি বিক্রি হয়। স্ট্রবেরি চাষে খুব বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন দরকার হয় না।

 

মাল্টা
বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায় মাল্টা চাষ সম্ভব। উৎপাদনও হয়ে থাকে ভালো পরিমাণে।

 

 

ড. বাবুল চন্দ্র সরকার বলেন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট বারি মাল্টা-১ নামে একটি জাত উদ্ভাবন করেছে। এই জাতটির ফলন অনেক বেশি। আকারে বড় এবং অত্যন্ত মিষ্টি।

 

পরিপক্ব হওয়ার পরও এটি সবুজ রঙের হয়ে থাকে। প্রতি হেক্টরে ২০-২২ টনের মতো উৎপাদিত হয়ে থাকে।

 

কলমের মাধ্যমে সবুজ মাল্টার চারা উৎপাদন করা হয়। এককালীন খরচ হয়ে থাকে চারা কেনার সময়েই। এটির চারা রোপণের পরের বছরেই ফল দেখা দেয়। তবে ভাল ফলনের জন্য দুই বছর পর থেকে ফলন তোলা শুরু করাটা ভালো।

 

সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাজারে সবুজ মাল্টার সরবরাহ থাকে।

 

তিনি বলেন, বাজারে যে হলুদ রঙের মাল্টা পাওয়া যায় সেটি অনেক সময় টক হতে পারে। তবে সবুজ রঙের মাল্টা সম্পূর্ণভাবে পাকার পর সেটি অত্যন্ত মিষ্টি হয়।

 

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের তথ্য মতে, হলুদ রঙের মাল্টার আমদানি ১০-২০ শতাংশ কমাতে পেরেছে সবুজ রঙের বারি মাল্টা-১।

 

ড. সরকার বলেন, অনেক সময় কৃষকরা মাল্টা পেকে যাওয়ার আগেই সেটি গাছ থেকে তুলে ফেলেন। যার কারণে ফলটি পরিপূর্ণভাবে পাকার সময় পায় না এবং মিষ্টিও হয় না, অসম্পূর্ণ থেকে যায় এর পুষ্টিগুণও।

 

তিনি বলেন, মাল্টা লেবুজাতীয় ফল। আম বা কলার মতো এটি একবার গাছ থেকে ছেড়ার পর আর পরিপক্ব হয় না।

 

রাম্বুটান
লিচুর বিকল্প হিসেবে মনে করা হয় রাম্বুটানকে। লাল রঙের ফল ভেতরে লিচুর মতোই দেখতে। খেতেও লিচুর মতোই। এটি মালয়েশিয়ান একটি ফল। তবে এটি শীতে তেমন একটা টিকে থাকতে পারে না। গরমের সময় এর ফলন বেশ ভাল হয়।

 

 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ড. মেহেদি মাসুদ জানান, রাম্বুটান ফলনের জন্য একবেলা রোদ এবং একবেলা ছায়া দরকার হয়। এ জন্যই এটি মিশ্র বাগানে অন্য গাছের সাথে চাষ করার পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে।

 

তিনি বলেন, বেশিক্ষণ সূর্যের আলোতে থাকলে এর পাতায় সানবার্ন হয় বা পুড়ে যায়। এজনই অনেকে শেডের ব্যবস্থা করে থাকেন। তবে শেড দিয়ে চাষ করা গেলে রাম্বুটানের উৎপাদনও বেশ ভালো হয়।

 

রকমেলন
এটি এক ধরনের তরমুজ। মূলত সাউথ আফ্রিকান একটি ফল। তবে সম্প্রতি এটি বাংলাদেশেও চাষ হচ্ছে।

 

 

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের ওলেরিকালচার বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ফেরদৌসি ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বেশ ভালোভাবেই এটি চাষ করা সম্ভব হচ্ছে।

 

দেশের প্রায় সব জেলাতেই এটির উৎপাদন করা সম্ভব। তবে যেসব এলাকাতে বৃষ্টি কিছুটা কম হয় সেখানে এর ফলন বেশি হয় বলে জানান ড. ইসলাম।

 

বাংলাদেশের গাজীপুর, সাতক্ষীরা এলাকায় এর ফলন বেশ ভালো হয়।

 

ড. ইসলাম বলেন, ‘এটা তরমুজের মতোই। তাই যেসব জমিতে তরমুজ ভালো হয় সেখানে রকমেলনও ভালো হবে।’

 

একবার বপনের পর তিন থেকে চার বার ফলন তোলা সম্ভব। এটি চাষাবাদে খুব বেশি খরচও হয় না। তবে বাজারে এর চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে।

 

লংগান
এটিও লিচুর মতো। অনেকে এটাকে কাঁঠলিচু বা আঁশফলও বলে থাকেন। তবে দেশি কাঁঠলিচু বা আঁশফলে বীজটি অনেক বড় থাকে এবং মাংস বা শাঁস অনেক পাতলা হয়। যার কারণে এটি জনপ্রিয়তা পায়নি।

 

 

তবে লংগানের শাঁস অনেক বেশি ও মোটা এবং বীজ ছোট। সাথে এটি মিষ্টি হওয়ার এর জনপ্রিয়তা রয়েছে।

 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ড. মেহেদি মাসুদ জানান, লংগান বাংলাদেশে একটি সম্ভাবনাময় ফল। বাজারে এটি ৭০০-৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।

 

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের উদ্ভাবিত জাত বারি লংগান-২ বেশ জনপ্রিয় জাত। লিচুর বিকল্প হিসেবে এই ফলটিকে গণ্য করা হয়। জুলাই-অগাস্ট মাসে এটি পরিপক্ব হয়।

 

অ্যাভোকাডো
শুধু বাংলাদেশ নয় বরং বিশ্বের সম্ভাবনাময় ফলের মধ্যে একটি হচ্ছে অ্যাভোকাডো। পুরো বিশ্বেই এটি বেশ দামিও বটে। বাংলাদেশেও এটি চাষাবাদের চেষ্টা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে এটি ড্রাফটিং করা সম্ভব হয়েছে।

 

 

ভালো মানের কোলেস্টেরলের জন্য এটি বিশ্বে বেশ জনপ্রিয়। জুলাই-অগাস্ট মাসে এটির ফলন হয়। বছরে একবার ফলন দেয় এটি।

 

এ ছাড়া পার্সিমন নামে একটি ফলও উৎপাদনের চেষ্টা চলছে বাংলাদেশে। তবে এটি এখনো পরীক্ষামূলক অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়া কাশ্মীরি ডালিমও বাংলাদেশে একটি সম্ভাবনাময় ফল।
তথ্যসূত্র : বিবিসি বাংলা

 

এবিএন


অর্থনীতি বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ


_