এএফএম মমতাজুর রহমান আদমদীঘি (বগুড়া) থেকেঃ
হেমন্তের শুরুতেই প্রকৃতিতে পরিবর্তন এসেছে উত্তরের জেলা বগুড়াতে। কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে সকাল সন্ধ্যা। মৃদু শীত অনুভূত হচ্ছে উত্তরে। কুয়াশার কারণে সূর্যের আলো দেখা না গেলেও বসে থাকে না শাঁওইল হাটের কম্বল, চাদরের ক্রেতা বিক্রেতারা। বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার এই হাটে শীত নিবারণের চাদর কম্বল বেশ প্রসিদ্ধ। দাম কম হওয়ায় দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতারা ভিড় করেন এ হাটে। গার্মেন্টসের অব্যবহৃত কাপড় কিনে এনে এখানে বের করা হয় সুতা। সেই সুতা থেকেই তৈরি হয় চাদর এবং কম্বল। শাঁওইল হাটকে কেন্দ্র করে আশপাশের গ্রামগুলোতে বসছে অনেক তাঁত। এসব তাঁতেই কাজ করছেন হাজারো শ্রমিক। শীতের আগমনী বার্তায় কর্মমুখর হয়ে উঠেছে বগুড়ার আদমদীঘির শাঁওইল বাজার। ঝুট কাপড় থেকে সুতা তৈরি, কম্বল, চাদর বানানো এবং বিপণন চলছে সমান তালে। প্রতিদিন কোটি টাকার ব্যবসা হয় এই বাজারে। তবে এখানে রয়েছে নানা সমস্যা। অবকাঠামো, বিশুদ্ধ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশা। বাংলাদেশের তাঁত শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভূমিকা বগুড়ার আদমদীঘির শাওইল বাজার। শীতের আগমনে সরগরম হয়ে উঠছে শীত বস্ত্র চাদর ও কম্বল তৈরী ও বেচা কেনায়। শীত যতই ঘনিয়ে আসছে ততই কম্বল চাদর সহ শীত বস্ত্র তৈরীতে কারিগররা ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছেন। এখন আর আগের মত শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করে তাঁত মেশিন চালাতে হয়না, এখন হস্ত চালিত যান্ত্রিক মেশিনে বিদ্যুতের ছোঁয়ায় বদলে গেছে এখানকার তাঁত শিল্প প্রতিষ্ঠান। শত শত পরিবার এই পেশায় এখন সাবলম্বী হয়েছে।
আদমদীঘি উপজেলা সদর হতে মাত্র ৭ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত শাওইল বাজার। এই বাজারে প্রতি বুধবার ও রবিবার হাট বসে। তাঁত শিল্পকে ঘিরে শাওইল সহ কেশরতা বিনাহালী, মঙ্গলপুর, মুরইল, দেলুঞ্জ, মুরাদপুর, ছাতনি সহ প্রায় ৭৬ গ্রামে তাঁত শিল্প রয়েছে। সুতার দাম কাচা মাল ও রংয়ের দাম বৃদ্ধির কারনে তৈরী শীতবস্ত্র বিক্রি করে আর তেমন লাভবান হচ্ছেনা তাঁতিরা। তাই অনেকেই এই পেশা কোন রকমে ধরে রেখেছে। উত্তরবঙ্গেওবৃহৎ এই তাঁতি গোষ্ঠী আজও ধরে রেখেছে তাঁত সংস্কৃতি।
এামুন হোসেন,নূর হোসেন,মোহসীন,শাহীন,রাজু,মোফাজ্জল হোসেন সহ বেশ কয়েকজন তাঁত শিল্প ও চাদর ব্যবসায়ীগন জানানতাঁত শিল্পকে ধরে রাখতে হলে সরকারী পৃষ্টপোষকতা দেয়া প্রয়োজন।
সরজমিনে দেখা গেছে শাওইল গ্রামে অনেক আগে থেকেই তাঁতি শ্রেনীর মানুষের বসবাস। যার কারনে শাওইল গ্রামে তখন থেকেই এক ভিন্নধর্মী হাট গড়ে উঠে। যার ফলে শীতের চাদর কম্বল গামছা ও উলের (উলেন) সুতা কেনাবেচা হয়। পর্যায়ক্রমে এই হাটের প্রাচীনতা আর জনপ্রিয়তার জন্য এবং চাদর কম্বল মূলত এই হাটে বেচাকেনা হয় বলে এই হাটের নাম দিয়েছে মানুষ “চাদর কম্বল হাটের গ্রাম”। সপ্তাহের রবিবার ও বুধবার ভোর রাত থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত চলে এই হাট। এ হাটকে ঘিরে প্রায় ৭৬ গ্রামে গড়ে উঠেছে তাঁতি পল্লী। তারাই কম্বল কেন্দ্রিক এ শিল্পের এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। যখন শাওইলের হাট বসে তখন মনে হয় যেন মেলা বসেছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারী ব্যবসায়ীদের পদচারনায় সব সময় মুখরিত গ্রামের পথঘাট। রাজধানী ঢাকা চিটাগাং সিলেট খুলনা দিনাজপুর রংপুর রাজশাহী সহ সারাদেশ থেকে ব্যবসায়ীরা এসে চাদর কম্বল ও উলেন সুতা কিনে ট্রাক যোগে নিয়ে যান। এখানকার তৈরী চাদর ও কম্বল বিদেশেও রপ্তানী হয়ে থাকে। এ পেশায় ২০ হাজারের অধিক পরিবার সাবলম্বী হয়েছে। শাওইল হাট ও বাজারের শুরুতে পাঁচটি দোকান থাকলেও এখন শাওইলের দোকান রয়েছে ছোট বড় মিলে প্রায় ৮শতাধিক। এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রুহুল আমিন জানান, এখানকার তৈরী চাঁদর কম্বল ও গামছা অত্যন্ত উন্নতমানের হওয়ায় দেশ বিদেশে এর চাহিদা বেড়েছে। কোন ধরনের প্রচার ও সরকারি-বেসরকারি সাহায্য সহযোগিতা ছাড়াই এখানে গড়ে উঠেছে বিশাল এই কর্মত্রে। শাওইল হাট কমিটির সভাপতি মোঃ আতোয়ার রহমান ও বিশিষ্ঠ হাজী গুলবর রহমান জানান, এ হাটে বর্তমানে ব্যাংক এশিয়া’র একটি মাত্র এজেন্ট ব্যাংকিং রয়েছে। তবে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বেচা কেনা হলেও এখানে কোন সরকারী বা বেসরকারী পূর্নাঙ্গ ব্যাংক স্থাপন আজও হয়নি। ফলে ব্যবসায়ীরা টাকা নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুমা বেগম বলেন, ‘আমাদের পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আছে। এ ব্যাংকের মাধ্যমে যদি আমরা তাঁতিদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করতে পারি তাহলে তারা একটা মূলধন পাবে। যার মাধ্যমে তাদের ব্যবসাটা আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।’