
খালেক পারভেজ লালু, উলিপুর (কুড়িগ্রাম): ‘মোর আর বাড়ি ভাঙার চিন্তা নাই। সরকার নদীর পাড় বান্ধা শুরু করছে। স্বপ্নেও মুই ভাবং নাই, কোনোদিন এই নদীর পাড় বান্ধিবে। এই নদী মোক ২০ বছর ধরি বন্যার পানির মতো ভাসি নিয়া বেড়াইছে। পোত্তমে বিশ্বাস করেং নাই। এখন দেখি সত্যি, নদী বান্ধিছে।’
এভাবে তিস্তা নদীর পাড় বাঁধার কার্যক্রম নিয়ে নিজের আবেগ প্রকাশ করছিলেন উপজেলার ফকিরপাড়া গ্রামের নদীর কূলের বাসিন্দা বিধবা গোলাপি বেওয়া। দীর্ঘ অপেক্ষার পর নদীর পাড় বাঁধাইয়ের কাজ শুরু হওয়ায় সহায়-সম্বল সুরক্ষার আশা জেগেছে গোলাপির মতো আরও অনেকের।
হোকডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা অটোচালক মো. শফিয়াল হক বলেন, নদীর পাড় থেকে বাড়ি সরানোর জন্যে ফাসি দেওয়া বাজারের পাশে জমি কিনেছেন। এই পাড়ের ভাঙন ঠেকাতে বাঁধাইয়ের কাজ শুরু হওয়ার কথা শুনতে শুনতে আশাই ছেড়ে দিয়েছিলন। সেই আশা আবার জেগেছে। এখন আর বাপের ভিটা হারাতে হবে না- এই আনন্দে চোখ ভেজান শফিয়াল। তিনি জানান, বাঁধের কাজ শুরু হওয়ায় বুকে আশা জাগছে। আর পৈতৃক ভিটা ছেড়ে যাবেন না। এর আগে চার বার বাড়ি ভেঙেছে। এখন আর নদী ভাঙবে না।
গোলাপি বেওয়া ও শফিয়াল হকের মতো কুমারপাড়া গ্রামের খয়বার আলী, ভেন্ডারপাড়া
তিস্তার বাম তীর ভাঙন রোধ প্রকল্পের কাজে উলিপুরের থেতরাই ইউনিয়ন ও বজরা ইউনিয়নের পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বাঁধের কাজ চলমান
গ্রামের আব্দুল জলিল ও মো. পারভেজ আলী বলেন, নদীভাঙন রোধে সরকারের এ উদ্যোগে তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সুরক্ষাপ্রাপ্তি নিশ্চিত হতে যাচ্ছে।
সরেজমিন নদীতীরের প্রকল্প অংশ ঘুরে দেখা যায়, তিস্তা নদীর বাম তীর ভাঙন রোধ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। তিস্তাপাড়ের থেতরাই ইউনিয়ন ও বজরা ইউনিয়নের পাঁচ কিলোমিটার নদীর বাম তীর ভাঙন রোধে কাজ শুরু হয়েছে। এলাকার মানুষ সেই
কাজ দেখছে দলে দলে এসে। শুধু তাই নয়; ঠিকাদারদের নানাভাবে সহযোগিতা করছে স্থানীয়রা।
নদীর কূলের মানুষ জানায়, এই বাঁধ তিস্তাপাড়ের মানুষের জন্য কী- তা বলে বোঝানো কঠিন। নদীতে পানি এলেই এখানকার মানুষ ভয়ে কুঁকড়ে থাকে। সেই ভয় দূর হয়ে স্বপ্ন জাগছে নদীর দুকূলজুড়ে জীবন আর জীবিকার ক্ষেত্র গড়ে তোলার।
স্থানীয়রা জানান, বাড়ি ভাঙার প্রস্তুতি নিতে হতো প্রতি বর্ষায়। সেই চিন্তা এখন আর থাকবে না।
এ কাজের মাধ্যমে দীর্ঘ দিনের দাবি পূরণ হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, কুড়িগ্রাম বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন প্রকল্পের (দক্ষিণ ইউনিট) আওতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নে ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার ও বজরা ইউনিয়নে ৩ কিলোমিটার তিস্তা নদীর বাম তীর ভাঙন রোধে সতর্কতামূলক কাজ শুরু করে। ৬টি প্যাকেজে ৫টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ কাজের দায়িত্ব পায়। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ হবে।
থেতরাই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নুরুজ্জামান সরকার জানান, তিনি নিজে মাঝে মাঝে কাজ দেখতে যান। যেটুকু দেখেছেন, কাজ মোটামুটি ভালো হচ্ছে। ঠিকাদারদের কাজটা ভালো করার জন্য অনুরোধ করেছেন। কাজটা হয়ে গেলে তিস্তাপাড়ের দুটি ইউনিয়নের ৫০টি গ্রামের লাখো মানুষ নদীভাঙন থেকে মুক্তি পাবে।
প্রকৌশলী মো. জাহিদ হাসান বলেন, ইতোমধ্যে কাজের অগ্রগতি প্রায় ৮০ ভাগ। আশা করা যায়, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারবেন। চেষ্টা করছেন কাজের মান নিশ্চিত করতে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের বলেন, ভাঙন রোধের কাজটি সম্পন্ন হলে তিস্তার পাড়ে বসবাসকারী ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা ৩০ হাজার পরিবার নিরাপদ হবে। কাজটি ভালোভাবে করা হচ্ছে, যাতে টিকসই হয়।