👁 57 Views

নিরাপত্তাকৌশল যাতে সরকারপ্রধানকে জনগণ থেকে দূরে না রাখে: প্রধানমন্ত্রী

মুক্তিনিউজ২৪.কম ডেস্ক : জনগণ যাতে নিজেদেরকে সরকারপ্রধান থেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করে, সেভাবে নিরাপত্তা কৌশল বিন্যাস করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

রোববার (৫ জুলাই) ঢাকা সেনানিবাসে প্রেসিডেন্ট গার্ডস রেজিমেন্টের (পিজিআর) সদর দপ্তরে বাহিনীর ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।

গণতান্ত্রিক সরকারপ্রধানের নিরাপত্তার প্রশ্নে নিজের ভাবনা তুলে ধরতে গিয়ে তারেক রহমান বলেন, আমি এর আগে এসএসএফের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আমার একটি উপলব্ধির কথা শেয়ার করেছিলাম, যেহেতু আপনারাও রাষ্ট্র এবং সরকার প্রধানের নিরাপত্তায় নিয়োজিত, সেহেতু আপনাদের জন্যও কথাটি প্রযোজ্য বলে আমি মনে করি। সেটি হলো, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রায়শই জনসভা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করতে হয়। ফলে সেই সকল অনুষ্ঠানে আপনাদেরকেও দায়িত্ব পালন করতে হয়। এই ধরনের অনুষ্ঠানে ব্যাপক জনসমাগমের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই কিছুটা জটিলতাপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব কর্মসূচির পালনের সময় একদিকে সরকারপ্রধানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা, অপরদিকে নাগরিক জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত রাখা —এই দু’টির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই আপনাদেরকে নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন করতে হয় । আপনাদের প্রতি আমার আহ্বান, নিরাপত্তা কৌশল এমনভাবে বিন্যাস করা জরুরি—জনগণ যাতে নিজেদেরকে সরকারপ্রধান থেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করেন। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে আমি জনগণের বিশ্বাস এবং ভালোবাসার উপর আমার আস্থা এবং নির্ভরতা বজায় রাখতে চাই। নিরাপত্তা কৌশল যাতে সরকারপ্রধানকে জনগণ থেকে দূরে ঠেলে না দেয়, সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখার জন্য আমি আপনাদের প্রতি বিশেষভাবে আহ্বান জানাই।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তার বড় ছেলে বলেন, পিজিআরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে আমার জীবনের সবচেয়ে শোকাবহ এবং হৃদয় বিদারক ঘটনা, আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের কথা মনে পড়ছে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের সময় কর্তব্য পালনরত পিজিআরের কয়েকজন সদস্যও শহীদ হয়েছিলেন। আজকের এই বিশেষ দিনে আমি পিজিআরে’র সেই সকল শহীদদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। আল্লাহর দরবারে তাদের মাগফেরাত কামনা করছি। দায়িত্ব পালনের সময় তাদের নির্মম মৃত্যুর মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের নিরাপত্তার প্রতি অটল আনুগত্য, কর্তব্যপরায়ণতা এবং জীবন উৎসর্গের যে চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়েছে, এটি অবশ্যই পিজিআরের সদস্যদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

তারেক রহমান বলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তায় ১৯৭৫ সালের এইদিনে প্রথমে ‘রাষ্ট্রপতির দেহরক্ষী ইউনিট’ নামে একটি নতুন রেজিমেন্ট আত্মপ্রকাশ করেছিল। পরবর্তীতে তৎকালীন সেনাবাহিনীপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ‘রাষ্ট্রপতির দেহরক্ষী ইউনিট’কে ‘প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট’ হিসেবে অভিহিত করেন। এই নতুন নামকরণ রেজিমেন্টের কার্যক্রমকে আরো আত্মপ্রত্যয়ী এবং গতিশীল করতে ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে । প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট-পিজিআর প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান একটি অবিস্মরণীয় এবং অনুপ্রেণামূলক নাম।

১৯৯১ সালে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি সরকার প্রধানের নিরাপত্তার দায়িত্ব এই রেজিমেন্টের উপর বর্তায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার বাবা-মা দুজনই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেয়াদের আল্লাহর রহমতে রাষ্ট্র এবং সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকায় সংগতকারণেই পিজিআরের কার্যক্রমের সঙ্গে আমি কিশোরবেলা থেকেই পরিচিত। পিজিআরের কাজটি অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং। কারণ রাষ্ট্র ঘোষিত অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নিরাপত্তা প্রদানের পাশাপাশি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার দায়িত্বপালন করাও আপনাদের অন্যতম কর্তব্য। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আপনাদেরকে নানা রকমের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। এইসব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আপনাদের বিশ্বস্ততা, দায়িত্ববোধ এবং কর্তব্যপরায়ণতার বৈশিষ্ট্য আপনাদেরকে নিঃসন্দেহে একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে পরিচিত করেছে।

সুশৃঙ্খলতার স্বীকৃতি স্বরূপ পিজিআর চলতি বছর ‘ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়ায় বাহিনীর সদস্যদের অভিনন্দন জানান সরকারপ্রধান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আপনাদের ইস্পাত কঠিন দায়িত্ববোধ অবশ্যই প্রশংসনীয়। আমি জানি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী হতে বিশেষভাবে নির্বাচিত ও প্রশিক্ষিত সদস্যগণই এই রেজিমেন্টে দায়িত্ব পালনের জন্য যথানিয়মে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট সেনাবাহিনীরই অধীন একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। সুতরাং পেশাদারিত্ব, আনুগত্য এবং শৃঙ্খলার সমন্বয়ে পিজিআর সদস্যগণ নিজেদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথারীতি পালন করবেন—এটিই বিধিবদ্ধ নিয়ম।

পিজিআর সদস্যদের উদ্দেশে সরকারপ্রধান বলেন, আপনাদের কার্যক্রমের মাধ্যমেই পিজিআরের দক্ষতা এবং একনিষ্ঠতা ফুটে উঠবে—এটি আমার প্রত্যাশা। পিজিআরের সদস্যগণ আপনারা যেহেতু সবাই সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সদস্য। ফলে আপনারাও সবাই বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত, যা আপনাদের এই রেজিমেন্টকে আরো দক্ষ আত্মবিশ্বাসী, এবং গৌরবান্বিত করেছে বলে আমি মনে করি।

তারেক রহমান বলেন, একটি দেশের সশস্ত্র বাহিনী দেশ এবং জনগণের সাহস এবং গৌরবের প্রতীক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্রবাহিনীর সাহসী ভূমিকা সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন এবং অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ফেলেছে। যেকোনো বাহিনীর সামনে প্রচলিত চ্যালেঞ্জের বাইরেও বর্তমানে আর্থ-সামাজিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিকাশের ফলে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। সাইবার যুদ্ধ, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, ড্রোন যুদ্ধ কিংবা তথ্যযুদ্ধ—এসব নতুন নতুন ক্ষেত্রগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এইসব বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শুধুমাত্র পিজিআরই নয়, প্রতিটি বাহিনীকেই আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদেরকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা জরুরি। একটি বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে সাহস, দক্ষতা, কৌশল এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে পিজিআরেরও পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সশস্ত্রবাহিনীর পাশাপাশি পিজিআর কিংবা এসএসএফের মতো সফিস্টিকেটেড বাহিনীগুলোকেও সরকার আরো আধুনিকায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ বিষয়ে যথানিয়মে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, সশস্ত্রবাহিনী যদি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ থেকে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণ এবং পেশাদারিত্ব বজায় রাখেন, তাহলে দেশের সার্বভৌমত্ব আর কখনই হুমকির সম্মুখীন হবে না, ইনশাল্লাহ। আমি আশা করব, পিজিআরের মত বিশেষায়িত বাহিনীর সর্বোচ্চ সফলতার জন্য আধুনিক নিরাপত্তা কৌশল এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি প্রতিটি সদস্যের সাহস- সততা -বিশ্বস্ততা -সৰসর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব-নিয়মানুবর্তিতা এবং সর্বোপরি ‘চেইন অব কমান্ড’ অনুসরণ—এই বিষয়গুলো কঠোরভাবে মেনে চলা অপরিহার্য।

প্রধানমন্ত্রী পিজিআর সদর দপ্তরে একটি গাছের চারা রোপণ করেন এবং পরিদর্শন বইয়ে সই করেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত বিগ্রেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামছুল ইসলাম, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, পিজিআরের কমাডেন্ট বিগ্রেডিয়ার জেনারেল গোলাম আরিকুল আলমসহ সামরিক কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *