👁 420 Views

বন্যা-ভাঙনের মাঝেও কুড়িগ্রামের চরবাসীর স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখছে গবাদিপশু পালন।

 
খালেক পারভেজ লালু,( কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি 
বন্যা, নদীভাঙন, খরা আর অনিশ্চিত কৃষির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষের কাছে গবাদিপশু পালন এখন জীবিকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অবলম্বন হয়ে উঠেছে। ফসলহানির ঝুঁকিতে থাকা হাজারো পরিবার গরু-ছাগল- হাঁস – মুরগি  পালন করে সংসারে ফিরিয়ে আনছে স্বচ্ছলতা, কমছে দারিদ্র্য।
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও পরিবেশবিদ মির্জা নাসির উদ্দিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত এক দশকে বন্যা ও নদীভাঙনের প্রকোপ প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নদীভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চরাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গবাদিপশু পালন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সম্প্রতি সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ঝুনকার চরে একটি অসুস্থ গরু দেখতে গিয়ে খামারি ওসমান গনীর সঙ্গে কথা বলেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান।
 
ওসমান গনী বলেন, গরু পালন এতটাই লাভজনক যে প্রয়োজনে ঋণ নিলেও গরু বিক্রি করে সহজেই তা পরিশোধ করা যায়। এমনকি গবাদিপশু দেখিয়েও এনজিও থেকে ঋণ পাওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, একটি গরুর বাছুর এক বছর পর ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। আমার মতো পরিবারের জন্য এটি বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা।
 
জেলার বিভিন্ন এনজিও সূত্রে জানা গেছে, পশুপালনের জন্য বীমা সুবিধা রয়েছে। মাত্র ১২ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হয়। কোনো কারণে বীমাকৃত পশুর ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কুড়িগ্রামে বর্তমানে গরুর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ২৩ হাজার, মহিষ ১১ হাজার, ছাগল ৭ লাখ ৪৫ হাজার, ভেড়া ১ লাখ ৪৯ হাজার এবং ঘোড়া রয়েছে ৩ হাজার ২১৬টি। এর মধ্যে চরাঞ্চলেই গবাদিপশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, জেলার প্রায় ৬০ শতাংশ গবাদিপশু চরাঞ্চলে লালন-পালন করা হয়। বছরের বেশির ভাগ সময় এসব পশু খোলা মাঠে চরিয়ে পালন করেন খামারিরা।
তিনি বলেন, বন্যার সময় গবাদিপশুকে অবশ্যই নিরাপদ ও উঁচু স্থানে রাখতে হবে। পাশাপাশি আগে থেকেই পর্যাপ্ত শুকনো খাদ্য সংরক্ষণ করা জরুরি। বন্যার পানিতে ডুবে থাকা ঘাস বা দূষিত খাবার গবাদিপশুকে খাওয়ানো উচিত নয়। একই সঙ্গে বন্যার ময়লা পানি পান করানো থেকেও বিরত থাকতে হবে।
বর্ষা ও বন্যার সময় গবাদিপশুর ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। তাই বিশুদ্ধ পানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন খাদ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি পশুর স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, জুন ও জুলাই মাসে এ অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি বেশি থাকে। নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রমের সম্ভাবনা দেখা দিলে আগেই গবাদিপশুকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। অন্যদিকে খরার মৌসুমে খড় ও ঘাস মজুত রাখতে হবে। গবাদিপশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার সুযোগও সবসময় রয়েছে।
 
সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য রহিম উদ্দিন হায়দার রিপন বলেন, চরাঞ্চলের মানুষ প্রথমে ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে বন্যার পূর্বাভাস পান। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন এনজিও এবং ভয়েস কলের মাধ্যমেও তথ্য পৌঁছে যায়। সাধারণত তারা ৫ থেকে ১০ দিনের বন্যার পূর্বাভাস পেয়ে থাকেন।
জেলার ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, ফুলকুমার ও জিঞ্জিরামসহ ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় প্রায় সাড়ে চারশ’ চর রয়েছে। এসব চরে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস।
 
উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের মোল্লার হাট চরের বাসিন্দা মোঃ মোকলেছুর রহমান বলেন, চরে কৃষি আবাদ করে খুব একটা লাভ হয় না। তাই গরু – ছাগল কিনে এনে পালন করি। এখন চারটি গরু রয়েছে।ছাগল আছে ৫ টি। বছরে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় হয়। কোনো গরু বা ছাগল অসুস্থ হলে নৌকায় করে বড় হাটবাজারে নিয়ে যাই, না হলে ফোন করে এলাকার পশু ডাক্তারকে ফোন করে ডাকি।
 
সাহেবের আলগা চরের কালু মিয়া বলেন, চরের মানুষের সবসময় দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। কৃষির পাশাপাশি গরু পালন না করলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যেত।
পোড়ার চরের নুর জাহান বেগম বলেন, আমার স্বামী ঢাকায় কাজ করেন। আমি বাড়িতে গরু পালন করি। এখানে গরু পালনে অতিরিক্ত খরচ হয় না। চরের ঘাসেই গরু মোটাতাজা হয়। পরে গরু বিক্রি করে বছরে ভালো আয় করা যায়।
 
তিনি জানান, তার মতো নারী খামারিরা ওয়ার্ড দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে আবহাওয়া সতর্কতা পান। পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ বিভাগের লোকজন নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
 
সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. আব্দুল গফুর বলেন, ইউনিয়নের ২৫টি চরে প্রায় ২০ হাজার পরিবারের বসবাস। পুরুষদের অনেকেই কর্মসূত্রে বাইরে থাকায় বাড়িতে থাকা নারীরাই গবাদিপশু পালন করে পরিবারের আয় বাড়াচ্ছেন। বর্তমানে গবাদিপশু পালন চরবাসীর অন্যতম প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।
 
কুড়িগ্রাম জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা চর উন্নয়ন কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, নদী বেষ্টিত জেলা কুড়িগ্রাম এ জেলায় রয়েছে প্রায় সারে ৪থেকে ৫ শতাধিক চর। তারা নদী ভাঙন, বন্যা খরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে একপ্রকার যুদ্ধ করে বেচে থাকে, তাদের একমাত্র গবাদি পশু পালনই রক্ষা কবচ, তিনি চরাঞ্চলের মানুষের জীবন মান উন্নয়নে গবাদি পশুপালনে আরও উৎসাহ দিতে সরকারি -বে সরকারি পর্যায়ে সহায়তা দানের দাবী জানান।
 
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, চরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর ঘাস জন্মায়। ফলে গরু-ছাগল পালনে খাদ্য ব্যয় কম হয় এবং খামারিরা লাভবান হন। প্রাণিসম্পদ বিভাগ নিয়মিত চিকিৎসা, টিকাদান ও কারিগরি পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। তিনি চরাঞ্চলের মানুষকে গবাদিপশু পালনে আরও বেশি আগ্রহী হওয়ার আহ্বান জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *