২৮ বছর ধরে পায়ে হেঁটে সংবাদ খোঁজেন, নিজের ঠিকানাই নেই সাংবাদিক আজহার ইমামের

মুক্তিনিউজ২৪.কম ডেস্ক : প্রতিদিন সকালে কাঁধে কালো ব্যাগ, হাতে কলম ও নোটপ্যাড নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। কখনো শহরের অলিগলি, কখনো গ্রামের মেঠোপথ, কখনো হাটবাজার কিংবা সরকারি-বেসরকারি দপ্তর—সংবাদের খোঁজে ছুটে চলেন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। বয়সের ভার শরীরে, সংসারে অভাবের চাপ, অসুস্থ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী স্ত্রী এবং ছোট মেয়ের দায়িত্ব—সবকিছু নিয়েই তাঁর পথচলা। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে এই পথচলায় সঙ্গী হয়নি কোনো মোটরসাইকেল কিংবা সাইকেল। পায়ে হেঁটেই তথ্য সংগ্রহ করে সাংবাদিকতা করে যাচ্ছেন দিনাজপুরের বিরামপুরের প্রবীণ সাংবাদিক আজহার ইমাম।

৬০ বছর বয়সী আজহার ইমামের সাংবাদিকতা জীবনের শুরু ১৯৯৬ সালে। প্রথম কাজ শুরু করেন সাপ্তাহিক ‘হিলিবার্তা’ পত্রিকায়। সেখানে প্রায় ১০ বছর কাজ করেন। এরপর বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক ‘আজ ও আগামীকাল’ পত্রিকায় প্রায় পাঁচ বছর, দৈনিক ‘দুর্জয় বাংলা’য় পাঁচ বছর, ঢাকার দৈনিক ‘আমাদের অর্থনীতি’ এবং পরে দৈনিক ‘আমাদের সময়’ পত্রিকায় কাজ করেন। এরপর দৈনিক ‘কালবেলা’য় প্রায় চার বছর সাংবাদিকতা করেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক ‘আগামীর সময়’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

দীর্ঘ এই পথচলায় একাধিক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হলেও তাঁর জীবনযাত্রায় খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় কখনো নিজের একটি মোটরসাইকেল কিংবা সাইকেল কেনার সামর্থ্য হয়নি। তাই সংবাদ সংগ্রহের জন্য বছরের পর বছর পায়ে হেঁটেই ছুটতে হয়েছে তাঁকে। রোদ-বৃষ্টি, গরম কিংবা শীত—কোনো কিছুই তাঁর সংবাদ সংগ্রহের পথ থামাতে পারেনি। শহর থেকে গ্রাম, এক বাজার থেকে অন্য বাজার, কখনো কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে তথ্য সংগ্রহ করেছেন তিনি।

আজহার ইমামের জন্ম ও বেড়ে ওঠা বিরামপুর পৌর এলাকার স্কুলপাড়া গ্রামে। বাবা মৃত জফিরুল হাসান ফারুকী ছিলেন মসজিদের ইমাম। পাশাপাশি আরবি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াতেন। মা মৃত ফজিলাতুন নেছা ছিলেন গৃহিণী। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে আজহার ইমাম তৃতীয়। বড় ভাই মোটর শ্রমিক ইউনিয়নে চেইন মাস্টার হিসেবে কাজ করতেন। ৬০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। আরেক ভাই বাবু দিনমজুরের কাজ করেন।

১৯৮২ সালে মাধ্যমিক পাস করেন আজহার ইমাম। পরে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করেন। পড়াশোনা শেষে জীবিকার স্থায়ী কোনো অবলম্বন গড়ে তুলতে না পারলেও সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে আঁকড়ে ধরেন। কিন্তু এই পেশা তাঁকে আর্থিক নিশ্চয়তা দিতে পারেনি।

একসময় বিরামপুরের স্কুলপাড়া এলাকায় তাঁদের ২৩ শতক বসতভিটা ছিল। পারিবারিক সম্পত্তি ভাগ-বণ্টনের সময় ভাইবোনদের মধ্যে জমি বণ্টন করা হয়। আজহারের ভাগে থাকা জমিও মায়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে বিক্রি করতে হয়। সেই থেকে নিজের ভিটেমাটি হারিয়ে এখন ভাড়া বাড়িতে বসবাস করছেন তিনি। জীবনের দীর্ঘ সময় সংবাদ সংগ্রহে ব্যয় করলেও নিজের জন্য স্থায়ী একটি আশ্রয় তৈরি করতে পারেননি।

ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর সংগ্রামের শেষ নেই। স্ত্রী লাবনী খাতুন শারীরিক প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ। একমাত্র মেয়ে আয়েশা লাবিবা তুবা বর্তমানে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। স্ত্রী-সন্তানের দায়িত্ব, সংসারের খরচ এবং নিজের বয়সজনিত নানা সীমাবদ্ধতা নিয়েই প্রতিদিন সাংবাদিকতার কাজে বের হন তিনি। কখনো শরীর সায় দেয়, কখনো দেয় না; তবু সংবাদ সংগ্রহের অভ্যাস থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারেন না।

নিজের সাংবাদিকতা জীবন নিয়ে আজহার ইমাম বলেন, ‘১৯৯৬ সালে সাপ্তাহিক হিলিবার্তা দিয়ে আমার সাংবাদিকতা শুরু। এরপর একে একে বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছি। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে সাংবাদিকতা করছি। আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় কোনো দিন মোটরসাইকেল বা সাইকেল কিনতে পারিনি। তাই পায়ে হেঁটেই সংবাদ সংগ্রহ করেছি। এখনো প্রতিদিন সকালে ব্যাগ, কলম ও প্যাড নিয়ে বের হই। শহর-গ্রাম ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করি। সাংবাদিকতাই আমার জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাংবাদিকতা করতে গিয়ে অনেক কষ্ট করেছি। কিন্তু জীবনে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীর কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে কোনো সুবিধা নিইনি। একসময় দিনাজপুর-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক আমাকে বাড়ি করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আশ্বাস বাস্তবায়ন হয়নি। এখন নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমার মতো একজন অসহায় সাংবাদিকের পাশে কেউ দাঁড়াবেন কি না, জানি না।’

সাংবাদিকতা কেবল তাঁর পেশা নয়, দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে দীর্ঘ ২৮ বছরের অভিজ্ঞতার পরও তাঁর জীবনে আর্থিক নিরাপত্তা আসেনি। নেই নিজের বাড়ি, নেই সংবাদ সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় বাহন, নেই নিশ্চিত জীবিকার অন্য কোনো অবলম্বন। তবু প্রতিদিন কাঁধে কালো ব্যাগ নিয়ে পথে নামেন তিনি। কারণ, সংবাদ খুঁজে বেড়ানোই তাঁর জীবনের দীর্ঘদিনের চর্চা।

আজহার ইমামের জীবন তাই শুধু একজন প্রবীণ সাংবাদিকের ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়; এটি মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতার আড়ালে থাকা অনেক মানুষের আর্থিক অনিশ্চয়তা, অপ্রাপ্তি ও নীরব আত্মত্যাগেরও প্রতিচ্ছবি। যে মানুষটি বছরের পর বছর অন্যের সুখ-দুঃখ, অনিয়ম, সম্ভাবনা ও সংকটের খবর তুলে ধরেছেন, তাঁর নিজের জীবনের খবরও যেন সমাজের মনোযোগ দাবি করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *